21/08/2019 , ঢাকা

আবার সাংবাদিক নির্যাতন: নিরাপত্তার দায় কার?


প্রকাশিত: 21/08/2019 04:35:57| আপডেট:

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। দেশের প্রতিটি সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা বিধানের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। প্রায় প্রতিদিনই কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে লাঞ্ছিত-নিগৃহীত হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীরা। প্রতিটি সরকারের সময়ে, সব ধরনের পরিস্থিতিতে। কখনও শারীরিকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, কখনও শিকার হচ্ছে হয়রানির। কখনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে, কখনও রাষ্ট্রের হাতে। স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নেমে আসে খড়গ। হামলা, মামলা, আর হয়রানিতে দুর্বিষহ করে তোলা হয় জীবন। সম্প্রতি সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসীদের হামলা এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলে লাইভ ও সংবাদ প্রচারের ওপর বিধিনিষিধ আরোপের বিষয়টি রীতিরকম অশনী সংকেত। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ডেইলী স্টারের ফটোসাংবাদিক শায়েল রেজা, সেলিম সাদমান ও প্রতিবেদক রফিকুল ইসলামকে ঝিগাতলায় সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তোলার সময় মারধর করে থানায় নিয়ে ৪ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় এবং তাদের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। একই পত্রিকার আরেক সাংবাদিক সুষ্মিতা সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে লাঞ্ছিত হন সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে। ধানম-িতে পুলিশের সামনে ধরে ধরে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে হেলমেট পরা যুবকরা। এ ছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমের আরো অন্তত চারজন সাংবাদিক চলমান আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহে আহত হয়েছেন। এ দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে টিভি চ্যানেলগুলোর স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। ফটোজার্নালিস্ট ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় আইসিটি অ্যাক্টে মামলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ফেসবুকে গুজব ও উসকানি ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় আবার৭ দিনের রিমান্ডও দিয়েছেন আদালত।

গণমাধ্যমের এ আক্রান্ত অবস্থায় দেশের গণতন্ত্র যে রুগ্নতম সময় পার করছে তা অনুমেয়। কেননা, গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র অবস্থানের দিক থেকে একই সুতোয় গাঁথা। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলেও পুলিশি নির্যাতনেরও শিকার হতে হয় সংবাদকর্মীদের। যদিও উভয়ই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে। কিন্তু রাজপথে, বিপজ্জনক মুহূর্তে মাঝেমধ্যে পুলিশই হয়ে পড়ে সাংবাদিকের প্রতিপক্ষ। পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতির ঝাল মেটান সাংবাদিকদের ওপর। পরে ‘গরু মেরে জুতা দান’-এর মতো মৌখিক দুঃখ প্রকাশও করেন। এটুকুতেই প্রতিকারের সমাপ্তি। একইভাবে রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিকের সম্পর্ককে আখ্যায়িত করা হয়- জল ও মাছের সম্পর্কে। কিন্তু যতই বস্তুনিষ্ঠ হোক, নিজের বা নিজ গ্রুপের বিপক্ষে গেলেই প্রতিপক্ষ হয়ে পড়েন রাজনীতিবিদরাও। তারাও হুমকি-ধমকি দেন, কর্মক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে সাংবাদিকদের ‘উপহার’ দেন বেকারত্ব। নিজস্ব সুবিধাবাদীদের দিয়ে মামলায় জড়িয়ে দেন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। আমলারা করেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নানা হয়রানি। সাংবাদিকতার নৈতিকতায় সাংবাদিকরা কারো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু হতে পারে না। অনিয়মের বিরুদ্ধে তাকে দাঁড়াতেই হয়। ফলে সাংবাদিকরা হয়ে পড়ে অপছন্দের পাত্র। তাদের গলা টিপে ধরতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে সবাই। অথচ অপছন্দের কথাগুলো তুলে ধরতে হয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের সময়েই সাংবাদিকদের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতনের খড়গ। রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হচ্ছেন তাই নয়, স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদদের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী চরমপন্থিদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, এমনকি খুন হচ্ছেন সাংবাদিকরা।

প্রতিটি সরকারের সময়কাল রঞ্জিত হয়েছে সাংবাদিকের রক্তে। অথচ শিল্প হিসেবে সংবাদমাধ্যমের বিকাশ ও সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিটি সরকারই থাকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কোনো সরকারের হাতেই প্রণীত হয়নি একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন। এমনকি দেশে একের পর এক সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটলেও কোনো খুনের বিচার প্রক্রিয়াই সুষ্ঠুভাবে এগোয়নি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি একটিরও। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দিনের পর দিন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তেমন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে সাংবাদিকতা পেশা ক্রমাগতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথাগত দুঃখ প্রকাশ ও হামলাকারীদের শাস্তির আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

প্রতিদিন সংবাদ পিপাসু মানুষের দ্বারে নতুন নতুন খবর নিয়ে হাজির হয় সাংবাদিকরা। তাদের লেখনি বা সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে সকালে চায়ের কাপে ঝড় থেকে শুরু করে মানুষ সুফল পেতে শুরু করে। নির্যাতিত মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে সাংবাদিকদের দারস্থ হয়। আর সাংবাদিকরা জাতির সামনে তুলে ধরে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সুখ, দুঃখ,হাসি কন্না,সাফল্য ব্যার্থতার কথা। কিন্তু সেই সাংবাদিক যখন নির্যাতিত হয় তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজও আমাদের রাজপথে দাঁড়িয়ে এই পৈশাচিক হত্যাও নির্যাতনের বিচার দাবি করতে হচ্ছে। এসব হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের বিচার না হলে সাহসী সাংবাদিক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। প্রতিষ্ঠিত হবে না আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার। তাই সরকার, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন রাখছি, সুষ্ঠু বিচার, প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থা গ্রহণের। সাংবাদিকদের পেশায় এ চলমান ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্র কি কোনো উদ্যোগ নেবে? দূর ভবিষ্যতে কি কোনো উজ্জ্বল আলো অপেক্ষা করছে?

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, ‘সংবাদপত্র বিষয়ক আইন গ্রন্থ’র’ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’।


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

সময় টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক জাকারিয়া মুক্তা মারা গেছেন

ময় টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক জাকারিয়া মুক্তা ভাই মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। শনিবার রাতে ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেছেন তিনি।

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আহত ১০

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে ঢুকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। হামলাকারীরা বর্ষীয়ান সাংবাদিকদের কক্ষ থেকে টেনে-হেঁচড়ে বের করে কিল-চড়-ঘুষি মারতে থাকে।

সাংবাদিককে গণধোলাই দিয়ে আটকের হুমকি পুলিশের

কনস্টেবল মমিন সাংবাদিকের ভিজিটিং কার্ড চান। পরে তাকে ভিজিটিং কার্ড দেওয়া হয়। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার নাম মমিন।

মন্তব্য লিখুন...

Top