22/08/2019 , ঢাকা

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নিজের বাসায় কাজ দিলেন মন্ত্রী


প্রকাশিত: 22/08/2019 17:50:02| আপডেট:

স্টার মেইল, ঢাকা: বাবা-মায়ের দেয়া নাম মো. জসিম উদ্দিন। আর রিয়াদি শামস নাম দিয়েছেন তার গুরু মা। তৃতীয় লিঙ্গের প্রত্যেকেরই একজন গুরু মা থাকেন। তাদের নাম দেন এই গুরু মা। জসিম এখন সবার কাছে রিয়াদি নামে পরিচিত। রিয়াদি শামস নামের তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষটি কাজ নিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জান খান কামালের বাসায়। দেড়মাস ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় তিনি পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে দিয়ে দেখা যায় রিয়াদি কাজে ব্যস্ত। কাজ শেষে রিয়াদির সাথে কথা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় বসে।

রিয়াদি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে খুব স্নেহ করেন। তার সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ-খবর রাখেন। মাঝে দু’দিন কাজে আসতে পারেননি। এ সময় বারবার বাসার অন্যদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছেন, রিয়াদি এল না কেন, তার অসুখ-বিসুখ হয়েছে কিনা বা কোনো অসুবিধায় আছে কিনা। তিনি রিয়াদির খোঁজ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রীও রিয়াদির প্রতি বিশেষ যত্নবান। রিয়াদির একটু কাশি হয়েছে, তাকে কাশতে দেখে মন্ত্রীপত্নী সেদিনই চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা করেন।

রিয়াদি ২০০৬ সালে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি, ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ডিগ্রি পাস করেন সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে। কবি নজরুল কলেজ থেকে ২০১৪ সালে অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করেন।

রিয়াদি জানান, তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কথা। বলেন, স্কুলজীবনে বিব্রত পরিস্থিতির শিকার হওয়ার কথা। সহপাঠীরা তার পোশাক খুলে দেখতে চাইত সে ছেলে না মেয়ে! রিয়াদি জানান, কলেজজীবনে তাকে নিয়ে সহপাঠীদের হাসিঠাট্টার কথা; কর্মক্ষেত্রেও।

কর্মস্থলে তিনি ছেলেদের পোশাক পরেই যেতেন। তবে বাসায় মেয়েদের পোশাক পরতেন। কর্মস্থলে প্রতিনিয়ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার কারণে টিকতে না পেরে তিন মাসের মাথায় মতিঝিলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু চাকরি নয়, এক পর্যায়ে এসে পরিবারও ছাড়তে হয়েছে তাকে।

পরিবার ছাড়া প্রসঙ্গে রিয়াদি বলেন, ‘দুটো ভাই-বোন আছে। তাই দুই বছর আগে বাসা ছেড়েছি। তাদের ভালোর জন্য পরিবার ছাড়তে হয়েছে। আমি তাদের ভালো চাই। তারা বড় হয়েছে। বিয়ে করবে। কেউ যদি শোনে যে, পরিবারে একজন এরকম মানুষ আছে, একসাথে থাকে তাহলে সহজে আত্মীয়তা করতে চাইবে না। তাই আমি তাদের ছেড়ে এখন দয়াগঞ্জে অন্য বাসায় থাকি। সাথে আমার কমিউনিটির একজন থাকেন।’

পরিবারের সবাই যাত্রাবাড়ীতে থাকেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে। বাবা নেই, মারা গেছেন। পরিবার থেকে বেরিয়ে আমি আশ্রয় নেই দয়াগঞ্জে আনোয়ার নামের তৃতীয় লিঙ্গের একজনের কাছে। তিনি আমার গুরু মা। তার কাছে আসার পর তিনি আমার নতুন নাম দেন। শুরু হয় আমার নতুন জীবন। শুরু হয় গুরু মার অধীনে ‘ডোল–ছল্লা’ করা (ছল্লা হচ্ছে দোকান থেকে টাকা তোলা আর ডোল হচ্ছে কোনো অনুষ্ঠানে ঢোল বাজিয়ে নেচে গেয়ে টাকা নেওয়া)।’

এভাবেই চলছিল রিয়াদি শামসের জীবন। গত বছর জানতে পারেন রি-থিংক নামের একটি সেচ্ছাসেবী ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান আছে। যারা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয় এবং কর্মসংস্থানের চেষ্টা করে। সেখানে তিনি পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর রি-থিংক এর পরিচালক লুলু আল মারজানের অনুরোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে নিজের বাসায় কাজ দেন। যেন সমাজে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়। সবাই যাতে উদ্বুদ্ধ হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসার কাজ করা আরেকটি মেয়ে সুবর্ণা আক্তার সাথী খান। তিনি বলেন, ‘উনি (রিয়াদি) মেয়ে না ছেলে তা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে, আমাদের কাছে উনি একজন মানুষ। তাকে দেখেও কিছু বোঝা যায় না। সবার সাথে মুক্তমনে চলাফেরা করেন। সুন্দর করে কথা বলেন। কাজেও খুব ভালো। আমাদের সাথে খুব ভালোই মেলে। বাসার সবাই ওনাকে খুব পছন্দ করেন।

মন্ত্রীর বাসার বাবুর্চি বাবুল মিয়া বলেন, ‘সে আমাদের সাথে ভালোই কাজ করছে। সে ভালো, আমরা ভাই-বোনের মতো মিলে মিশে কাজ করি।’

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত মন্ত্রীর বাসায় কাজ করেন রিয়াদি।

জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাজ দেওয়ার পর যখন জানতে পারেন রিয়াদি মাস্টার্স পাস, তখন তিনি খুব খুশি হন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমি জানতাম না যে, ও উচ্চশিক্ষিত। আমি মনে করেছিলাম সে লেখাপড়ায় খুব বেশি এগোয়নি। কিন্তু দেখলাম সে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছে। এখন আমার নিজেরই অস্বস্তি লাগছে যে, ওকে আমি ক্লিনারের চাকরি দিয়েছি!

মন্ত্রী বলেন, আমি তো চাচ্ছি ওদের সবাই কাজ করুক; মানে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি বা কাজ পাক তারা। অন্য দশটা মানুষ অর্থাৎ আমাদের দেশের জনগণ যেভাবে বেঁচে আছে, যেভাবে তাদের জীবিকার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের জন্য, জাতীর জন্য যে অবদান রাখছে, সমাজের জন্য অবদান রাখছে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও ঠিক সেভাবে কাজ করে এগিয়ে যাবে- এটা হল আমাদের সবার উদ্দেশ্য।

আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। আমি মনে করি শিগগিরই সেই আইন অনুযায়ী তারা তাদের সুবিধা পাবেন। আমাদের মন মানসিকতা চেঞ্জ করতে হবে। দেখুন আরো গভীরে যান, এরা পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধীকারী হয় না, এরা ভোটাধিকার প্রাপ্ত হয় না, এরা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে না। এরা একটা সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। তাহলে কি হলো? কি দাঁড়ালো অবস্থাটা? আমরা সেজন্যই মনে করি যে, এদেরকে এভাবে চলতে দেওয়া যেতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের মারজান (রি থিংক-এর পরিচালক) এদের নিয়ে কাজ করছেন। আমি ওকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন। এদের দুঃখ-দুর্দশা বুঝে এদেরকে মূলস্রোতের সঙ্গে নিয়ে আসছেন। বিভিন্ন জায়গায় এদের কর্মসংস্থাণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি মনে করি, সমাজের সবাই যদি এগিয়ে আসে তাহলে আমরা এদেরকে দুর্দশা থেকে রক্ষা পারি।’

এদিকে, একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পাশে এভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাঁড়ানোর বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেকেই। তারা বলছেন, সবাই যদি এভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতো!

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘সবাই তো মানুষ। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিক মুল্যবোধ থাকাই তো খুব স্বাভাবিক। সেটি সমাজে বেশি বিরাজ করুক। বেশি প্রস্ফুটিত হোক, সেই প্রত্যাশা করি।’


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

ঝিনাইদহে হিজড়াদের বিচার চাইলেন হিজড়ারা

লিঙ্গ কর্তনকারী হিজড়াদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন অপকর্মে প্রতিবাদ,

ঝিনাইদহে সাপের কামড়ে কিশোরের মৃত্যু

ওঝার কাছে ঝাড়ফুঁক করার পর কিছুটা সুস্থবোধ করলে সাকিবকে বাড়িতে আনা হয়।

স্পিরিটের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ, হয়ে যাচ্ছে বিদেশি ব্র্যান্ডের মদ!

অনুমোদিত বিভিন্ন বার ও ক্লাব থেকে বিদেশি মদের খালি বোতল সংগ্রহ করে ভেজাল মদ ঢুকিয়ে নতুন লেভেল লাগিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন...

Top