20/06/2019 , ঢাকা

বিয়ে ঠিকঠাক ছিল রাব্বির


প্রকাশিত: 20/06/2019 20:04:03| আপডেট:

বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা হচ্ছিল। নিজ গ্রামের একজনের সঙ্গে কথাবার্তাও এগিয়েছে অনেক দূর। পাবনার আতাইকুলার মোহাম্মদ আইয়ুব আলী ও মা রত্মা খাতুন তাদের ছেলে আমির হোসেন রাব্বির জন্য সানন্দে পাত্রী খুঁজছেন। পরিবারজুড়ে আনন্দের ভাব। ঘরে আসবে নতুন বৌ। অথচ বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন থামিয়ে দিয়েছে আমির হোসেন রাব্বির জীবন। সঙ্গে ফিকে হয়ে গেছে তাদের পরিবারের স্বপ্নও। এফ আর টাওয়ারের ১২তলায় ইউআর শিপিং পরিবহনে গত দেড় বছর ধরে কাজ করতেন রাব্বি।

থাকতেন ঢাকার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকায় আসেন ২০১৪ সালে। তখন থেকে মালিবাগে থাকতেন। শিপিং কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার পর থেকে নিকুঞ্জের বাসায় উঠেন।

রাব্বির সঙ্গে ওই বাসায় থাকতেন শহীদুল ইসলাম। তিনি জানান, ১০ দিন আগে হঠাৎ একদিন আমার রুমে এসে রাব্বি ভাই আচমকা একটা প্রশ্ন করেন বসেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন ধরেন আমাদের বাসার কেউ যদি হঠাৎ করে মারা যায় তাহলে আপনারা কি করবেন? তখন আমি তাকে পাত্তা না দিয়ে অন্য বিষয়ে কথা ঘুরিয়ে নেই। এখন ভাবতে কষ্ট হচ্ছে যে, তিনি প্রশ্নটা কেন করেছিলেন? রাব্বি ভাই কি জানতেন তিনি ক’দিন পরই চলে যাবেন। মনে হয় তিনি বিষয়টি টের পেয়েছিলেন।

শহীদুল আরো বলেন, রাব্বি ভাই সব সময় বাসার সবার খোঁজ-খবর নিতেন। সকালে সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। বৃহস্পতিবারও নিজে ঘুম থেকে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। এরপর অফিস যান। দুপুরের পর থেকে তার খবর না পাওয়ায় হাসপাতালে খোঁজ করি। পরে তো ঢাকা মেডিকেলে তার লাশ পাওয়া যায়। ক’দিন পরই হয়তো তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসতেন। অথচ কি নির্মম জীবন। তার আগেই তিনি চলে গেলেন।

ঢাকায় থাকলেও পাবনার আতাইকুলার বাড়িতে ঈদ ও কোনো উৎসব ছাড়া যাওয়া হতো না রাব্বির। এজন্য পরিবারের সদস্যরা একটু মন খারাপ করতেন। সেজন্য ছেলেকে বিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন তারা। আশা করেছিলেন, বিয়ের পর রাব্বি হয়তো নিয়মিত বাড়িতে আসা-যাওয়া করবে। অথচ রাব্বি একেবারের জন্য চলে গেলেন, পাবনায় আতাইকুলায় তার বাবা-মায়ের কাছে।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা রাব্বির বাবা-মা। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গ্রামের বাড়িতে। শোকের মাতমে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস।

রাব্বির পিতা আইয়ুব আলী জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে পাবনায় গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন রাব্বী। বিয়ে করবে বলে ঘর করতে কিছু ইটসহ সরঞ্জাম কিনে বাড়িতে রেখেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বাড়িতে আসার কথা ছিল তার। কিন্তু আমার ছেলে এভাবে বাড়িতে আসবে ভাবতে পারিনি।

শুক্রবার দুপুরে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গ্রামের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে বনানীর আগুনে নিহত আমির হোসেন রাব্বির। দুপুর আড়াইটায় চরপাড়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে তাকে চরপাড়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় এলাকার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন।

এর আগে রাব্বির লাশ একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। এসময় এলাকায় এক বেদনাবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রাব্বির স্বজন এবং প্রতিবেশীদের কান্নায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

নিহত আমির হোসেন রাব্বি ওই গ্রামের আয়ুব হোসেনের একমাত্র ছেলে। তার আর দুই বোন রয়েছে। তিনি পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ইংরেজীতে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করে বনানীর ওই ভবনে ১১ তলায় একটি প্রতিষ্ঠানে গত ৩ বছর চাকরি করতেন। তিনি খিলক্ষেত নিকুঞ্জ এলাকায় থাকতেন।

নিহত রাব্বির বন্ধু গিয়াস উদ্দিন জানান, তিনি শনাক্ত করেন আমির হোসেন রাব্বির (২৯) লাশ। পরে তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়।

পরিবারের লোকজন জানান, নিহতর বন্ধু গিয়াস উদ্দিন মর্গে তার লাশ শনাক্ত করার পর তাদের জাননো হলে তারা বিষয়টি জানতে পারেন।

তার লাশ পৌঁছানোর কথা জেনে এলাকার শত শত নারী-পুরুষ-শিশু তাদের বাড়িতে তাকে একনজর দেখতে ভিড় করে। সেখানে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গীর আলম, আতাইকুলা থানার ওসি মনিরুজ্জামান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত হন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের লোকজনকে সান্তনা দেন।

পাবনার জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাঁথিয়া ইউএনওকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।

সাঁথিয়া উপজেলার আর- আতাইকুলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম জানান, রাব্বি খুব ভাল ছেলে ছিলেন। তার অকালমৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

প্রসঙ্গত, বনানীর এফ আর টাওয়ারে বৃহস্পতিবার দুপুরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ভবনের নবম তলায় আগুনের সূত্রপাত। পরে ছড়িয়ে পড়ে ২৩ তলা ভবনের বেশ কয়েকটি তলায়। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস।

ভয়াবহ এই আগুনে ২৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের লাশও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আহত অন্তত ৭৩ জন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বনানীর অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনায় সারা দেশে মানুষ শোকাহত। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতন। বাতাসে ভাসছে লাশের গন্ধ। তবে এমন মৃত্যু কাম্য নয়। আমরা শোকাহত, আমরা শোকাহত। আমরা পরিত্রাণ চাই।


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

গণফোরামে যোগ দিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার

পুলিশ পিটিয়ে আটক হলেন এসআই

পরে প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে স্বজনদের খবর দিলে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাতে শাওনকে ঢাকায়

পরিবহন ধর্মঘটের জন্য ট্রেনের ছাদে যাত্রা, ফিরলো লাশ হয়ে

ঢাকায় অফিসের কাজে একটি ট্রেনিং শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ড্যানিয়েল। তার সঙ্গে আমিও বাড়িতে ফিরছিলাম। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার

মন্তব্য লিখুন...

Top