21/01/2019 , ঢাকা

ভোটাধিকার প্রয়োগে নারীদের ভূমিকা


প্রকাশিত: 21/01/2019 03:04:21| আপডেট:

আশরাফুল নয়ন: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার, নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার জন। আর সারা দেশের হালনাগাদ চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী দেশে এখন মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। এ তালিকায় নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন প্রায় ৪৩ লাখ ২০ হাজার। আর মৃত্যুর কারণে পূর্বে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন প্রায় ১৭ লাখ ৪৮ হাজার জন। হালনাগাদ চূড়ান্ত তালিকার ভোটারা এবারের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগে অংশগ্রহন করতে পারবে। দেশের উন্নয়ন,অগ্রযাত্রায় পছন্দ মত প্রাথীকে ভোট দিতে পারবে। চূড়ান্ত এ ভোটার তালিকার মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা পাঁচ কোটি ২৫ লাভ ১২ হাজার ১০৫ জন, অর্থাৎ মোট ভোটারের ৫০ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া নারী ভোটারের সংখ্যা পাঁচ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

এক কথায় সারা দেশের মোট ভোটারের অর্ধেক হচ্ছে নারী ভোটার। সে কারণে ভোটধিকার প্রয়োগে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বর্পূণ একটি বিষয়। কয়েক দিন আগে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বলেছেন, পুরুষ ও নারী উভয়ের ভোটের মর্যাদা সমান। নারীর ভোটাধিকার দিয়েই রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। নারীদের বাদ দিয়ে গণতন্ত্র সুসংহত করা সম্ভব নয়। তাই নারীরা যাতে কেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীন ভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেরকম পরিবেশ পুরুষদেরই তৈরী করে দিতে হবে।

“নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ এবং সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ” শীর্ষক এ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম আরো বলেন, আমাদের সমাজে নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই কম। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগে ঘরের পুরুষের প্রভাব থেকে যায়। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। তাই অধিকার আদায়ে নারীদের সৎ সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বলেন, ‘নারীদের বলতে হবে এটা আমাদের পৃথিবী, এখানে নিরাপদ অবস্থান আমাদের অধিকার। কবিতা খানমের কথাগুলো সম্পূর্ণ যৌত্তিক। নারীদের ভোটাধিকারের পরিবেশ পুরুষদের করে দিতে হবে। কিন্তু সেই পরিবেশ তৈরীর পরিবেশটাও তো অতিব গুরুত্বপূর্ণ।

আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বিংশ শতাব্দীর আগে কোনো দেশেই নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। তবে উনিশ শতকের শেষদিকে এসে ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন, কিছু অস্ট্রেলীয় উপনিবেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যের নারীরা সীমিত আকারে ভোটের অধিকার অর্জন করেন। গণতন্ত্রের শুরু যে দেশ থেকে, সেই গ্রিসেও নারীদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। সেখানে ভোট দিতে পারতো শুধু জমির মালিক ও পুরুষরা। ইউরোপ-আমেরিকায় যে আধুনিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ, সেখানেও নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছে মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা দেখে অনেক দেশ নারীদের ভোটাধিকার দিতে বাধ্য হয়।

অতীত থেকে জানা যায়, ইউরোপের ফিনল্যান্ডে সর্বপ্রথম নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করে। সে সময় এই দেশটি রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ১৯০৭ সালে ফিনীয় নির্বাচনে নারীরা প্রথমবারের মতো সংসদে নির্বাচিত হন। ১৯১৩ সালে নরওয়ে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে নারীদের পূর্ণ ভোটাধিকার প্রদান করে। দুই বিশ্বযুদ্ধ-মধ্যর্বতী পর্বে বেশিরভাগ স্বাধীন রাষ্ট্র নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। কানাডা ১৯১৭ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯১৮ সালে ভোটাধিকার পান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯২০ সালে। তবে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে নারীদের ভোটাধিকার দেরিতে প্রদান করা হয়। স্পেনে ১৯৩১ সালে, ফ্রান্সে ১৯৪৪ সালে, ইতালিতে ১৯৪৬ সালে, গ্রিসে ১৯৫২ সালে, সুইজারল্যান্ডে ১৯৭১ সালে নারীরা ভোট দেওয়ার অধিকার পায়। লাতিন আমেরিকার সিংহভাগ দেশ ১৯৪০-এর দশকে নারীদের ভোট প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করে। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার কিছু মুসলিম দেশে নারীদের ভোটাধিকার থাকলেও এখনো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ইসলামিক দেশে নারীদের ভোটাধিকার নেই। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নারীরা প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়।

এবার আমাদের দেশের কথা বলি। বাংলাদেশের কোন কোন গ্রামে নারীদের ভোট কেন্দ্রে আসা বা ভোট দেওয়া কিছুদিন আগেও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ ছিলো। আবার যদিওবা নারী ভোট কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে কিন্তু কাকে ভোট দেবে না–দেবে, এই সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীর নয়। স্বামী বা পরিবারের অন্য মুরব্বিদের সিদ্ধান্তে নারীরা প্রার্থী পছন্দ করেন। এখন এই ধারা অনেকটা পরির্বতন হয়েছে।

তবে এখনও সে প্রভাব সম্পর্ণরুপ কাটেনি। আমাদের সম্পর্ণভাবে এ ধারা হতে বের হয়ে আসতে হবে। সেজন্য বাঙ্গালী নারীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ভোট দেওয়ার আগে যাকে দেবেন, তার সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিতে হবে। যাকে ভোট দিলে সমাজের উপকার হবে বলে আপনি নিজে মনে করবেন, আপনি শুধু তাকেই ভোট দেবেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুরোধে নয়। পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ভোট দিতে যাবেন এবং ওই নির্দিষ্ট সময়টুকু আপনি নিজের সঙ্গে কথা বলে সঠিক মানুষ বেঁচে নেবেন। আপনার একটি ভোটই বদলে দিতে পারে সমাজের চিত্র।

উন্নয়ন অভিধানে উন্নয়নের নারী একটি অতি আধুনিক সংযোজন এবং এমন একটি ধারণা যা বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। উন্নয়নে নারী বলতে বোঝায়, নারীরা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ও উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণের পরিবেশ অনুকূল করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের নারীরা বরাবরই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সনাতনী ধ্যানধারণা ও মূল্যবোধ এবং লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও সুশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বহু সুযোগ-সুবিধা থেকে প্রায়শ তারা বঞ্চিত হয়।

নারীরা সন্তান ধারণ করে, সন্তান জন্ম দেয়, তাদের প্রতিপালন করে এবং সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করে। কিন্তু কখনো তারা নিজেদের কাজের জন্য যথোপযুক্ত মজুরি ও স্বীকৃতি পায় না। চাকরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পারিবারিক, আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নারীরা তেমন পায় না। গ্রামীণ পর্যায়ে ৮৪ ভাগ এবং শহরে ৫৯ ভাগ নারী অবৈতনিক ‘গৃহপরিচারিকা’ হিসেবে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘণ্টা বেশি সময় কাজ করে। যদিও ঘর গৃহস্থালির কাজে যুক্ত নারীর শ্রমকে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে কর্মকাণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থমূল্য এখন পর্যন্ত জাতীয় আয় গণনায় হিসাব করা হয় না।

তবে বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে চোখে পড়ার মতো অনেক অগ্রগতি হয়েছে। দেশের উন্নতির ক্ষেত্রে মূলত রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

আসন্ন নির্বাচন গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করার একটি সুযোগ। এ জন্য প্রয়োজন জনগণের মতের প্রতিফলন হয় এমন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন। ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন ভোটারের মধ্যে আপনি একজন। আপনার একটি সচেতন ভোট পাল্টে দিতে পারে অনেক কিছু । কাজেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত হবেন না। কারও প্ররোচনায় প্রভাবিত হবেন না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ই-মেইল: [email protected]


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

এবারের নির্বাচন কি উৎসব নাকি উৎকন্ঠা?

নির্বাচনের সময় যতই এগিয়ে আসছে, সহিংসতা ক্রমেই ততটা ভায়বহ রুপ নিচ্ছে। এতে বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দল কেউই বাদ যাচ্ছে না। তবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের পুলিশী

মালয়েশিয়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুরের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মালয়েশিয়া শাখা কতৃক আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সভাপতিত্ব করনে মো: শাহিনুল ইসলাম পাটোয়ারী সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মালয়েশিয়া শাখা, সঞ্চালনায় ছিলেন এম রায়হান কবীর, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র লীগ মালয়েশিয়া শাখা । বাংলাদেশ থেকে ভিডিও […]

ঝিনাইদহে রাস্তা নির্মাণে দুর্নীতি, কাজ বন্ধ করলো জনগণ

৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন রাস্তার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে এলাকাবাসি। রাস্তা থেকে উঠানো পুরানো পাথরের সঙ্গে আবর্জনা

মন্তব্য লিখুন...

Top