26/03/2019 , ঢাকা

‘মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না’


প্রকাশিত: 26/03/2019 16:06:45| আপডেট:

মোহাম্মদ আবু নোমান: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমূল্য বাণী ছিলো- ‘বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না’ এবং বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উক্তি, যা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য চিরদিনের অনুপ্রেরণার বিষয়, তা হলো- ‘মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না।’ শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনই হয় কোনো-না-কোনো দিক থেকে ব্যতিক্রমী। এবারের নির্বাচনটি সেই দিক থেকে অধিকতর ব্যতিক্রমধর্মী। এই নির্বাচনে প্রায় সব দলই অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এই অংশগ্রহণ একেবারে মুক্ত ও অবাধ ছিল না। এবার মূলত সংসদে কার্যকরী বিরোধী দল থাকছে না।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দলের সাথে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকে, সেটা এবার হয়নি। গণতন্ত্র থাকতে হলে অবশ্যই বিরোধী দল থাকতে হবে, বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা হয় না। সরকার উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে নয়। একটি দলের টিকে থাকার মানদন্ড হচ্ছে জনভিত্তি, শুধু আয়োজনে সাজানো নির্বাচন বা ক্ষমতায় থাকাই বড় কথা নয়।

ইতোমধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, জাতীয় পার্টিই হতে যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল। দলের কোনো সদস্য মন্ত্রী হবেন না। বিরোধী দলীয় নেতা হবেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নির্বাচনে পর গত কয়েক দিন ধরে এই ইস্যুটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে রয়েছে জাতীয় পার্টি। ফলে দলটি সরকারে না বিরোধী দলে থাকবে তা নিয়ে ছিল আলোচনা। এ কয়দিনে জাতীয় পার্টি একাধিক বৈঠক করলেও এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি।

এদেশের বিচিত্র রাজনীতির কুটিল ও সুবিধাবাদী দলের মহাসমারোহ আমরা নির্বাচনের আগে থেকেই দেখছি! (ইতোপূর্বে কথিত স্বৈরাচারী) প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আজ দাবি করতে পারেন তার আমলে এখনকার চেয়ে কম গণতন্ত্র ছিল না! একথাও ঠিক যে, বর্তমান সংসদ থেকে ‘মাইনাস’ বিএনপির করুন পরিনতির কারণেই আজ জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল। একই সাথে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করেও জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে! যাকে বলা যায় ‘সরকারি বিরোধী দল’! দেশে যেমনিভাবে- সরকারি স্কুল, সরকারি কলেজ, সরকারি ব্যাংক, সরকারি কল-কারখানা, সরকারি অফিস-আদালত রয়েছে, তেমনি সরকারী বিরোধী দলও যে হতে পারে, বিগত দিনে দুনিয়াবাসীকেতো সেটা সাফল্যের সাথে ‘কাগজে কলমে’ স্বীকৃতির মাধ্যমে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি!

আর সংসদে সত্যিকারে শক্তিশালী বিরোধী দল থেকেই কি লাভ! কেননা, গত চার দশকে এ দেশে আমরা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, এই দুজন নেতার শাসন আর শোষণ যাই বলা হোক, সবটাই ছিল রূপকথার মতো। বিশেষ পরিস্থিতি ও বিয়োগান্ত ইতিহাস ধারন করে, নেতৃত্বের সংকট ও শূন্যতা তৈরি হওয়ায় নিয়তিই তাদের টেনে এনেছিল রাজনীতির পথে। তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা করে তারা নিজেদের জায়গা তৈরি ও একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাজনীতিতে তারা ছিলেন পরস্পর অমিত্র, বিদ্বেষপরায়ণ, প্রধান প্রতিপক্ষ বললেও কম বলা হবে। যার দৃষ্টান্ত পৃৃথিবীর কোথাও নেই। রাজনীতিতে এ দু’দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণেই দেশব্যাপী তৈরি হয়েছে বিভেদের এক অলঙ্ঘনীয় শিল পর্বত। যার বাস্তব উদাহরণ নির্বাচনের পরপর নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায় চার সন্তানের জননীকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে গণধর্ষণ করা। স্বামী ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েসহ সবাইকে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণ করার জন্য ১০-১২ জন মানুষ বাইরে নিয়ে যায়। ঘটনাটি অবলীলায় লিখে ফেলা যায়; কিন্তু বিবেকবান মানুষ কল্পনা করতে পারবেন, ঘটনাটি কতো বর্বরোচিত ও ভয়ংকর? যা দেশব্যাপী শান্তিপ্রিয় সর্বসাধারণের মনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কেউ কেউ বলে থাকেন বিএনপি রাজনীতিতে এবার নিচ্ছিহ্ন হয়ে যাবে। আসলে বিএনপি মরবে না! কারণ, একদিন আওয়ামী লীগের এ ধরনের নেগেটিভ রাজনীতির কারণেই বিএনপি বর্তমানের লাইফ সাপোর্ট থেকে প্রাণ পেয়ে বেঁচে থাকবে।

ক্ষমতা অর্জন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা অবশ্যই যুদ্ধ, তবে মনে রাখতে হবে তা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়। সুকৌশলের যুদ্ধ, কুকৌশলের নয়। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থেকে চাটুকারদের বাহবা পেলেও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় না, ইতিহাস তার আপন মনেই আবার ঘুরে যায়। দেশব্যাপী আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে, বর্তমানে যে উন্নয়নের ধারা চলমান রয়েছে, এসব জনবান্ধব কর্মকাণ্ডকে সামনে তুলে ধরে, রাজনৈতিক কলাকৌশল অবলম্বন করে গনতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে, জনগণের ভোটাধীকার ঠিক রেখে, বাক স্বাধীনতা ঠিক রেখে, যদি বিএনপিকে কোনঠাসা করা যেত তাহলে সেটা হত ক্ষমতাসীনদের সক্ষমতার প্রতিশোধ।

জিয়াউর রহমান ও বঙ্গবন্ধু, কারোর উপর কাউকে বিপরীতে দাঁড় করার চেষ্টাকে এদেশের মানুষ কখনোই মেনে নেবে না। যার যেমন অবস্থান, তাকে সে অবস্থানে রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে কারও অবদানকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই! বর্তমানের গণতন্ত্র আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল না। দেশে এরকম পরিস্থিতি ও প্রেক্ষপট রাজনৈতিক দলই তৈরী করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার বড় উদাহরণ হলো ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। তখনো বিএনপির জন্ম হয়নি। কিন্তু পরে খুনিদের সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে জারি হওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংসদে পাস করিয়ে নিয়ে বিএনপি পঁচাত্তরের হত্যাকা-ের দায়ভার নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিয়েছিল। যে কেউ একবার শেখ হাসিনার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করুন, কেউ যদি তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে পরবর্তীতে নিজেকেও হত্যার চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে কার অবস্থান কি হতো? বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এমন দু’টি দল, যারা কোন শক্ত বিরোধী পক্ষ বা বিরোধী দল রাখার পক্ষে নারাজ। রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু না থাকলেও দুর্দিন বলে যে কিছু আছে তা সব দলকেই মনে রাখতে হবে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়াকে ফোন করে ২৮ তারিখ গণভবনে আসার জন্য দাওয়াত দেন। উদ্দেশ্য, একসঙ্গে বসে কথাবার্তা বলা ও রাতের খাবার খাওয়া। ওই সময় বিএনপির নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোটের ৩ দিনব্যাপী হরতাল ডেকেছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বেগম জিয়ার ৩৭ মিনিট কথা হয়েছিল। ফোনে খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী করেছিলেন। আর শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া মানেন নি। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি, আপনি আসুন। খালেদা জিয়া বলেছিলেন- না, আমি যেতে পারব না। হরতালের মধ্যে আমি কোথাও যাই না…।

আওয়ামী লীগ সরকার যদি এখন কাজ করতে চায়, তাহলে অনেক কাজ করতে পারে। তাদের ইশতেহারে অনেক ভালো ভালো লক্ষ্যের কথা বলা আছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে তারা মন দিতে পারে। যদি সেটা তারা করে তো খুবই ভালো কথা। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দেশের কিছু অর্থনীতিবিদের দ্বিমত আছে। এখন তারা যদি ভিন্নমতকে বিবেচনা করে, গ্রহণ করে সেটা আরো ভালো। ক্ষমতাসীনরা যেন নির্বাচনী ইশতেহারটা ভুলে না যায়। ইশতেহারে আছে, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হবে এবং সংবিধান হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল। আইনের শাসনের মূল বক্তব্যই হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান; কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হবে, ইত্যাদি।’

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাক্সক্ষা থেকেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তোলা হয়েছিল একসময়। এই দাবি নিয়ে আন্দোলনের সামনের কাতারে ছিল আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই বাতিল হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রশাসনের উপর ভর করে দমন নিপীড়ন মামলা হামলা দিয়ে কখনোই সঠিক পথে এগোতে পারে না, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া।

পচাঁত্তরের পর আওয়ামী লীগের অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, কৌশল সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ আজকের এই অবস্থানে এসেছে। একটা ব্যাপার আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত, স্বাধীনতা আমরা এমনি এমনিতেই পাই নি, অনেক ত্যাগ, তীতিক্ষা, লাঞ্চনা, বঞ্চনা, শোষণ, শাসন, নীপিড়ন, গণহত্যা, ধর্ষণ এর মধ্যদিয়ে পেয়েছি।

রাজনীতি প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির খেলা। রাজনীতির মাঠে বিএনপিও একটি শক্তিশালী দল ছিলো। ক্ষমতায় থাকাকালীন জনগণের যতদুর না সেবা করেছে, তার চেয়ে নিজেদের শক্তি অপচয় করেছে বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে। তখন হয়তো তারা ভাবতেও পারেনি বর্তমানের মতো সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আজ গ্রেনেড, গুলি, কামান ব্যাতীতই বিএনপির উপর মহা সুনামি বয়ে গেল। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সূক্ষ্ম না স্থূল কারচুপি হয়েছে, এ নিয়ে আলোচনা চলছে, চলবে। বাস্তবতা হলো, বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে একেবারেই খাদের কিনারায় চলে গেছে।


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

স্বাধীনতা দিবস পালন করতে স্কুলের ২০ শিক্ষার্থী আহত

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হবিগঞ্জের বাহুবলে মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে উপজেলার সানশাইন প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড হাইস্কুল এবং দ্য হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দীননাথ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। […]

৪০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়নি

৪০তম বিসিএস পরীক্ষা আগামী ৩ মে আয়োজনে সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আ ই ম নেছার উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ২ এবং ৪ মে এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় ওইদিন এ পরীক্ষা আয়োজনে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি বলে জানা গেছে। ফলে ৪০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা যায়নি। […]

কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা

মঙ্গলবার সকালে রাজাপুর উপজেলার পশ্চিম বড়ইয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঝালকাঠির রাজাপুরে মেহেদী হাসান শুভ (২২) নামে এক কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত মেহেদী হাসান শুভ একই এলাকার মাহবুব হাওলাদারের ছেলে ও বড়ইয়া ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র । পুলিশ ও স্থাানীয়রা জানায়, সোমবার বিকেল থেকে শুভ বাড়ির বাইরে ছিল। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুভর […]

মন্তব্য লিখুন...

Top