15/11/2018 , ঢাকা

‘যাদের আমরা চরিত্রহীন বলে জানি, তাদের মুখোশ খোলা শুরু করবো’


প্রকাশিত:2:10 am | October 19, 2018 | আপডেট:

‘এখন থেকে ভবিষ্যতে এই আন্দোলনের পরে যাদেরকে আমরা চরিত্রহীন বলে জানি, তাদের মুখোশ খোলা শুরু করবো। আপনারা জানেন যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্যে, ভারতে শুরু হয়েছে আন্দোলন। আমরা কিন্তু বাংলাদেশেও চুপ থাকবো না। আজকের সংবাদ সম্মেলনে আমি এটা জানিয়ে দিতে চাই।’

বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে নারী সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলার প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় এসব কথা বলেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু ।

নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, ‘আমি আসলে আমাদের নারীদের চরিত্র রক্ষার দায়িত্ব কাউকে দিতে চাই না। আমাদের চরিত্র আমরাই রক্ষা করতে পারবো। এই দায়িত্ব আমি কাউকে দেবো না। সাংবাদিক সমাজকে এভাবে যারা হেনস্থা করছেন, অপদস্থ করছেন, অসম্মান করছেন, তাদেরকে এই অধিকার আমরা দেই নাই। এর আগেও আমরা দেখেছি, প্রকাশ্যে-টকশোতে ভয়ঙ্করভাবে অপমান করা হচ্ছে, সেই দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি। এধরনের লোকদের টকশোতে আনা উচিত না বলে আমরা সাধারণ মানুষ মনে করি।’

এসময় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে উদ্দেশ করে এক খোলাচিঠিতে মাসুদা ভাট্টি বলেন, ‘‘আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝেছি যে, যুক্তিহীন মানুষই সাধারণত ব্যক্তিগত আক্রমণ করে। একজন নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি সবসময়ে তার চরিত্রকে নির্দেশ করে আক্রমণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে,আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। একাত্তর টকশোর উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা আপনাকে (মইনুল হোসেন) বলেছেন, আপনি ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। এটা তিনি (মিথিলা ফারজানা) মেনে নেবেন না। কিন্তু আপনি অত্যন্ত রূঢ় হয়ে পুরো অনুষ্ঠানে কথা বললেন। বরাবরের মতোই সেটা ছিল আক্রমণাত্মক।’

তিনি আরও বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যায় যখন আপনি (মইনুল হোসেন) আমাকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে ক্ষমা চাইলেন, তখন আপনাকে আমি বলেছি— যে অন্যায় কাজটি আপনি করেছেন একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন টকশোতে, তার সাক্ষী অনুষ্ঠানটির লাখ লাখ দর্শক। তাদের অগোচরে আপনি একটি ফোন করে ক্ষমা চাইলে, আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে ক্ষমা করলেও যে অগণিত নারীকে আপনি অপমান করেছেন, তাদের ক্ষোভ কোনোভাবেই তাতে প্রশমিত হয় না। যেহেতু বিষয়টি ঘটেছে জনসমক্ষে, সেহেতু আপনাকে আপনার বক্তব্য প্রত্যাহারপূর্বক অপরাধ স্বীকার করে সবপক্ষের কাছে প্রকাশ্যে মার্জনা চাওয়াটা কাম্য। আশা করি, আপনি আমার ও আমার মতো অসংখ্য নারীর সম্মানহানির ক্ষতের জায়গাটি উপলব্ধি করবেন এবং প্রকাশ্যে সবার কাছে ক্ষমা চাইবেন।’

ব্যারিস্টার তানিয়া আমির বলেন, ‘মাসুদার ক্ষত, ব্যাথা তার একার না, আমাদের সবার। এটা শুধু নারী সমাজের না, এদেশের সব সচেতন মানুষের ক্ষত। এই প্ল্যাটফর্মে আমরা একটি পজিটিভ আউটকাম আশা করতে পারি কিনা? অর্থাৎ আমাদের যারা জনপ্রতিনিধি হবেন, তাদের একটি মিনিমাম সহনশীলতা আশা করতে পারি কিনা? আমাদের আইনে একটা টার্ম আছে ‘মোর‌্যাল টারপিচিউড’। এতে যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে সে নির্বাচন করতে পারে না। মোর‌্যাল টারপিচিউডের অধীনে কী কী অপরাধ, এটা কিন্তু লিপিবদ্ধ নেই আমাদের দেশে, ভারতে হয়ে গেছে। মোর‌্যাল টারপিচিউডের অধীনে আছে নারী নির্যাতন, যৌতুক এই ধরনের বিষয়গুলো। এর অধীনে যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে সে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হয়ে যায়। আমাদের জনপ্রতিনিধি যারা হবে, তাদের ন্যূনতম কিছু চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। এদেশের নাগরিক হয়ে আমরা দাবি করতেই পারি যে, ‘মোর‌্যাল টারপিচিউড’ এর সংজ্ঞাটা কী এবং এতে উপাদান কী কী— সেটা নির্ধারণ করতে পারি না? তাই আমি আহ্বান জানাবো— আমাদের নির্বাচনের আগে এই বিষয়গুলো কিন্তু চলে আসে ‘ইলেকশন জার্গনে’। আমরা নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রেও যদি প্রতিপক্ষ নারী হয়, এসব বিষয় প্রতিবাদ না করে জায়েজ করে ফেলি।’

কথা সাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন যে কথাটা বলেছেন, এধরনের কথা কেউ জনসম্মুখে বলতে পারেন না। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের জানা দরকার যে, এত বেশি হইচই করলে থলের বিড়ালটা কিন্তু বেরিয়ে পড়বে অচিরেই। আজকাল বিশ্বে মেয়েরা কিন্তু চুপ করে বসে থাকে না, তারা কিন্তু সোচ্চার। মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ, নারীত্ব সবকিছু আজকে জাগ্রত।’

সাংবাদিক মুন্নী সাহা বলেন, ‘এই জমানায় যদি কেউ মনে করে ভয় পেয়ে গেল কিনা, সে তাহলে এই জমানায় বাস করে না। আমরা আজকের প্রতিবাদটিকে একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই। আপনারা যখন আমাদের কাছে হেরে যাবেন, তখন আমাদের চরিত্র নিয়ে বলতে থাকবেন, আর আমরা কাজ করতেই থাকবো। কিন্তু ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আপনারা যারা নানা সময়ে রাজনৈতিকভাবে কলঙ্কিত, রাজনৈতিকভাবে চরিত্রহীন, আপনারা একটু সাবধান থাকবেন।’

তিনি বলেন, ‘আজকের এই প্রতিবাদ সব কলঙ্কিত চরিত্রহীনদের প্রতি আমাদের প্রতিবাদ। আমরা এই রাজনৈতিক চরিত্রটাকে একটু ঠিক করতে চাই। বাংলাদেশের পক্ষে যারা রাজনীতি করবেন, সেটাই আমাদের চিন্তা, এই ধরনের মাপকাঠি (বাংলাদেশের পক্ষে ) নিয়ে আপনারা রাজনীতি করতে আসবেন।’

এসময় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কোনও টকশোতে না রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুদের অনুরোধ করবো— তারা যেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে টকশোতে না ডাকে। আমি অনুরোধ করবো, আমার সাংবাদিক ভাইদের ব্যারিস্টার মইনুল যে অনুষ্ঠানে থাকবেন, সেই সংবাদ সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকবেন। আমি আমার তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বলে দিয়েছি এবং আমার বন্ধুদের বলেছি। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন শুধু নারীর শত্রু নয়, তিনি এখন গণশত্রু। এধরনের গণশত্রু প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও ক্ষমা করা যায় না। তার কোনও ক্ষমা নেই, ক্ষমার বাইরে যদি কোনও শাস্তি থাকে, সেটা আপনারা চিন্তা করতে পারেন।’

প্রতিবাদ সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন— নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা,বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাছিমা আক্তার সোমা, সাধারণ সম্পাদক আঞ্জুমান আরা শিল্পী। সাংবাদিকদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন— মিথিলা ফারজানা,নাসিমা খান মন্টি,শাহনাজ মুন্নী, ফারজানা রূপা, আঙ্গুর নাহার মন্টি, ফারহানা মিলি, নাদিরা কিরণ, মুনমুন শারমিন শামস প্রমুখ।


  
এ সম্পর্কিত আরও খবর...

ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন গ্রেপ্তার

ঢাকার উত্তরায় আ স ম রবের বাড়ি থেকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ১০টার দিকে

‘ব্যারিস্টার মঈনুল ইংরেজি খাওয়াটা শিখেছেন, ভদ্রতাটা শিখেননি’

ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন যুক্তরাজ্যে বার-অ্যাট-ল পড়তে গিয়ে ইংরেজদের খাবার খাওয়া শিখলেও ইংরেজদের ভদ্রতা শিখতে পারেননি বলে মন্ত

‘আপনারা মামলা করুন, আমরা যা করার করবো’

সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে নিয়ে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন অশালীন মন্তব্য করার প্রতিবাদে দেশের নারী সাংবাদিকরা কী ভূমিকা পালন করছেন,