সাভারে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ না করার পাশাপাশি সকল প্রকার অনিয়মের জঞ্জাল দূর করে এক বছরে যে কোন সময়ের চেয়ে দলিল সংখ্যা কম হলেও রাজস্ব বেড়েছে ৫০ কোটি টাকা বেশি। নিজেদের সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতাসহ বিভিন্ন মহল থেকে অনৈতিক প্রস্তার উপেক্ষা করায় নিয়মিত হুমকি ও সমালোচনায় পড়তে হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সাভারের সাব রেজিষ্ট্রার জাকির হোসেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে সাভার সাব রেজিষ্ট্রার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এমন তথ্য দেন তিনি।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রিতে ঘুষ, অতিরিক্ত টাকা দাবি ও দালালের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ পদে পদে হয়রানির খবর নিয়মিত ঘটে যাচ্ছে দেশের কোন না কোন স্থানে। এমনকি জমি-জায়গা নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ‘সংকটে’ পড়েননি বা ‘জিম্মি’ হতে হয়নি, এমন কাউকে পাওয়া বিরল।
রেজিস্ট্রি অফিসে জমির রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে প্রথমেই সামনে পড়ে ভয়ংকর পিয়ন। তারপর উমেদার, নকলনবিশ সর্বোপরি সাব-রেজিস্ট্রার।
দলিল লেখক থেকে ভয়ংকর পিয়ন, উমেদার, নকলনবিশের মাধ্যমে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কাজ করেন।
জমি রেজিস্ট্রি কালে যে পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়, তার একটা অংশ পেতেন সাব-রেজিস্ট্রার। আর এই টাকা আদায় হয় পিয়নের মাধ্যমে।
যুগের পর যুগ জমি কেনাবেচার করতে গিয়ে ভয়ংকর পিয়নের গড়ে তোলা, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খাজনা খারিজসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও দলিল প্রতি মোটা অঙ্কের উৎকোচ না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল স্বাক্ষর করছেন না বলে খোদ দলিল লেখক ও দাতা গ্রহীতারা অভিযোগ করে আসছেন। এই অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাব রেজিস্ট্রি অফিস সাভার সাব রেজিস্ট্রি অফিস। সেখানে পিয়ন থেকে শুরু করে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটে প্রবেশ না করলে সাভারে চাকরি করতে পারে না ভালো অফিসাররা।
চাকরির শুরু থেকে যেখানেই দায়িত্ব নেয়ার পরই সিন্ডিকেট ভেঙে গ্রাহকের হয়রানি বন্ধের পর আলোচনায় আসেন সাভারের সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন। দেশের মফস্বলে গিয়ে টিকে থাকতে পারলেও ঢাকার সভাড়ে গিয়ে তাকে পড়তে হচ্ছে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত মাফিয়াদের হয়রানিতে।
নিয়মিত মাশুয়ারাসহ নানা দাবি মেটাতে না পেরে বিভিন্ন ভাবে হতে হচ্ছে হয়রানির শিকার।
জাকির হোসেনের দাবি, সেই চক্রে সঙ্গে সবব রেজিষ্ট্রারদের সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে রয়েছেন স্থানীয় ও ঢাকায় কাজ করা কয়েকজন সাংবাদিকও।
বদলি করে দেওয়ার হুমকির সঙ্গে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে চরিত্র হননের কথাও শুনতে হচ্ছে তাকে।
এদের সঙ্গে কারা জড়িত জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে জাকির হোসেন বলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে সাভারের সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়েছেন সাভার অফিসের দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরার ভিত্তিতে সাময়িক ভাবে কাজ করে আসা পিয়ন। সিন্ডিকেট ভাঙতে গিয়ে এই পিয়নকে অফিস থেকে বের করে দিয়েছি, এতে অনেকই ক্ষুব্ধ হয়ে আমার পেছনে লেগেছে। এই অফিসে পিয়নের সঙ্গে দেখা করতে দেশের বহু সাব রেজিস্ট্রার সাভারে আসতো, গতমাসে তাকে বের করে দেয়ার পর থেকে অনেকেই আমার পিছে লেগেছে। আমি কাজ বিশ্বাসী, কে কি করলো বা বললো তা মাথায় নিচ্ছি না। সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে হয়রানি বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন স্যারদের জানানো হয়েছে। বলতে গেলে এই অফিসের জঞ্জাল দুর করায় স্যাররা অনেকেই খুশি হয়েছেন।
সাভার সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, কিছু মানুষের নিয়ম বহির্ভূত ভাবে কাজ না করায় তার বিরুদ্ধে একটি চক্র মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করছেন, এতে করে তার কাজে বাধা প্রদান করছেন তারা। নিয়মিত তাকে হয়রানি করার কারণে তিনি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি কোনও অনিয়ম বা অন্যায় করেননি। বরং সিন্ডিকেটের তদবির না রাখায় নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
এসব হুমকি ও অপপ্রচার উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন জাকির হোসেন।
এক বছরে ৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়: সাভার অফিসে যুগ দিয়ে নানা অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের গড়ে তুলা সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কাজ করায় গত এক বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হওয়ার তথ্যও দেন জাকির হোসেন।
তার দেয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালে সাভারে দলিল সংখ্যা হয়েছে ২৪ হাজার এক’শ ১৬টি। যা থেকে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে দুই’শ ৬৬ কোটি ৬৯ লাখ ৭ হাজার দুই’শ ৫৬ টাকা। ২০২৫ সালে দলিল হয়েছে চব্বিশ হাজার ৫৫ যা থেকে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে দুই’শ ৮৯ কোটি ২১ লাখ আট হাজার এক’শ নয় টাকা।
২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসের দলিল সংখ্যা ছয় হাজার এক’শ ৪৪ যা থেকে রাজস্ব আদায় রয়েছে ৬৫ কোটি এক লাখ চল্লিশ হাজার নয়’শ ৪৬ টাকা। অপরদিকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের দলিল সংখ্য পাঁচ হাজার চার’শত ৩৪ যা থেকে রাজস্ব আদায় রয়েছে ৮০ কোটি ৩৬ লাখ ৫৪ হাজার এক’শত ১৪ টাকা।
এ সব তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।